অনিক আর মেঘলার দেখা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজে, বাংলা বিভাগে। প্রথম দিনেই পরিচয়। মেঘলার চোখে ছিল ঝলমলে আত্মবিশ্বাস, কথায় ছিল স্পষ্টতা। অনিক ছিল একটু শান্ত, বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা ছেলে। তবু কেমন করে যেন দু’জনের মাঝে জমে উঠেছিল এক অদৃশ্য টান। প্রজেক্টের কাজ, কফি হাউসের আড্ডা, রবীন্দ্রসদনে নাটক দেখা—সব মিলিয়ে মেঘলা হয়ে উঠেছিল অনিকের জীবনের অপরিহার্য অংশ।
১
রাতের শহর আর স্টেশন
কলকাতার শহর যখন ধীরে ধীরে রাতের কম্বলের নিচে ঢুকছে, তখন স্টেশনগুলো হয়ে উঠছে আরেক জগতের খণ্ডচিত্র। টিউবলাইটের কমলা আলো, গার্ডের শিস, চায়ের ঠোকাঠুকি, আর কিছু অপেক্ষার মানুষ—এই নিয়েই স্টেশন বাঁচে, নিঃশব্দে।সেই শহরেরই এক কোণে, সেন্ট্রাল স্টেশনের ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে বসে আছে অনিক। বয়স পঁচিশের ঘরে, চোখে ক্লান্তির ছায়া, অথচ মনটা যেন জেগে আছে অদ্ভুত এক উত্তেজনায়।তার হাতে একটি পুরনো খয়েরি রঙের ডায়েরি। ডায়েরির পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, কিন্তু তার প্রতিটি লাইনে লেখা এক অমলিন প্রেমের গল্প। প্রেমিকার নাম—মেঘলা।
২
সেই কলেজ জীবনের দিনগুলো
অনিক আর মেঘলার দেখা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজে, বাংলা বিভাগে। প্রথম দিনেই পরিচয়। মেঘলার চোখে ছিল ঝলমলে আত্মবিশ্বাস, কথায় ছিল স্পষ্টতা। অনিক ছিল একটু শান্ত, বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা ছেলে।তবু কেমন করে যেন দু’জনের মাঝে জমে উঠেছিল এক অদৃশ্য টান। প্রজেক্টের কাজ, কফি হাউসের আড্ডা, রবীন্দ্রসদনে নাটক দেখা—সব মিলিয়ে মেঘলা হয়ে উঠেছিল অনিকের জীবনের অপরিহার্য অংশ। একদিন মেঘলা বলে ফেলল— “চলো, পালিয়ে যাই! কাগজ-কলম ফেলে দিয়ে, একটুখানি জীবনের খোঁজে।” অনিক হাসল, “জীবন তো তুইই… কোথাও যেতে হবে না। তুই পাশে থাকলেই হয়।”
৩
হঠাৎ বিদায়
তবে সব ভালোবাসার গল্পে যেমন ছন্দপতন আসে, এখানেও এল। মেঘলার বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। হঠাৎ বদলি হলেন দিল্লি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরিবার চলে গেল, আর অনিকের সঙ্গে যোগাযোগ যেন আস্তে আস্তে ফিকে হতে লাগল।শেষ দেখা ছিল হাওড়া স্টেশনে। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে মেঘলা বলেছিল, “তুই অপেক্ষা করবি তো?” অনিক শুধু মাথা নেড়েছিল।
তারপর কেটে গেছে পাঁচটি বছর। অনিক চাকরি পেয়েছে, জীবনেও অনেক কিছু বদলেছে—তবু রোজ রাতে সে সেই পুরনো ডায়েরির পাতা ওল্টায়, যেন মেঘলার সাথে কথা বলছে।
৪
ফিরে আসা
সেইদিন ছিল এক শুক্রবার, মার্চ মাসের মাঝামাঝি। অনিক অফিসের কাজ শেষ করে ফিরছিল। হঠাৎ মোবাইলে একটি মেসেজ—
ঘড়ির কাঁটা বলছে ১০:২৭। চারপাশে নির্জনতা। হঠাৎ দূরে একটা ট্রেন ঢুকল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর ইঞ্জিনের শব্দ মিলেমিশে তৈরি করল এক রহস্যময় দৃশ্য।
অনিকের চোখ স্থির হয়ে রইল। ট্রেন থামল। নেমে এল একটি মেয়ে—হাতের ব্যাগে গাঁদা ফুলের মালা, চোখে সেই চেনা হাসি।
৫
পুনর্মিলন
মেঘলা এগিয়ে এসে বলল, “তুই তো ঠিক যেমন ছিলি… শুধু চুলগুলো একটু বেশি বড় হয়ে গেছে।” অনিক চুপ করে রইল। চোখ ভিজে উঠেছে, কিন্তু সে হাসল।
“তুই এলি?” “হ্যাঁ, এসেছি। অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি এই পাঁচ বছরে… কিন্তু তোকে হারাতে চাই না আর।” “তুই কি দিল্লি ছেড়ে চলে এলি?” “না… দিল্লি আমার শরীরের ঠিকানা ছিল, মন তো সবসময় তোর কাছেই ছিল।”
একটা নিরবতা নামল। তারপর মেঘলা বলল, “চল, তোর পছন্দের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটা এখনো আছে তো?” অনিক মাথা নেড়ে বলল, “আছে। চা এখনো আগের মতোই মিষ্টি।”
৬
নতুন শুরু
স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে দুজন হেঁটে চলল। গা দিয়ে ভেসে এল রাতের ঠান্ডা হাওয়া, কিন্তু সেই হাওয়ায় ছিল এক উষ্ণতার ছোঁয়া। অনিকের মনে হল, পাঁচ বছর যেন কোনো অদ্ভুত স্বপ্ন ছিল, এখন সে জেগে উঠেছে। আর পাশে রয়েছে তার ভালোবাসা—মেঘলা।
তারা হেঁটে হেঁটে চায়ের দোকানে পৌঁছাল। অনিক বলল, “দুটো চা, একটা একটু কম চিনি”—যেমনটা মেঘলা পছন্দ করত।
মেঘলা হেসে বলল, “তুই এখনো আমার পছন্দ মনে রাখিস?” অনিক চুপ করে থাকল। কিছু অনুভব শুধু চোখ দিয়েই প্রকাশ পায়।
চা এল। দুজনে বসে রইল, কোনো কথা না বলে। শুধু নিঃশব্দে, একে অপরের পাশে।
শেষ ট্রেন আজ থেমেছিল। শুধু স্টেশনে নয়—দু’টি হৃদয়ের মধ্যেও।
Leave a Reply